জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তির (ইপিএ) আওতায় কয়েক ধাপে শুল্ক ছাড় দেবে বাংলাদেশ। ধাপগুলো শেষে যদি সব পণ্যে শুল্ক ছাড় দেওয়া হয়, তাহলে বাংলাদেশের রাজস্ব ক্ষতি দাঁড়াতে পারে বছরে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা। তবে এই চুক্তি সই না হলে স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের পর জাপানের বাজারে শুল্ক সুবিধা হারিয়ে বাংলাদেশের রপ্তানি তিন হাজার থেকে তিন হাজার ৬০০ কোটি টাকা পর্যন্ত কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। জাপানের সঙ্গে ইপিএ সই-সংক্রান্ত বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে এসব বিশ্লেষণ উঠে এসেছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, ইপিএ কার্যকর হলে জাপানি পণ্যের ওপর কাস্টমস শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক ও নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক ধাপে ধাপে প্রত্যাহার করা হবে। এতে বছরে প্রায় ২৪ কোটি ৮৩ লাখ ডলার বা স্থানীয় মুদ্রায় প্রায় তিন হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ছাড় দিতে হতে পারে। তবে শুরুতেই পুরো রাজস্ব ছাড় কার্যকর হবে না। প্রাথমিক পর্যায়ে জাপানের এক হাজার ৩৯টি পণ্য বাংলাদেশে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে। এসব পণ্যের বেশির ভাগই বর্তমানে শূন্য বা ১ শতাংশ শুল্কে আমদানি হয়। ফলে শুরুতে রাজস্ব ক্ষতি হবে কম। পরবর্তী সময়ে ধাপে ধাপে শুল্ক ছাড় বাড়বে। এক পর্যায়ে মোট ৯ হাজার ৩৫৪টি জাপানি পণ্য বাংলাদেশে শুল্কমুক্ত সুবিধার আওতায় আসতে পারে। সেটি হলে বছরে তিন হাজার কোটি টাকার কিছু বেশি রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হতে পারে বাংলাদেশ। তবে এ পর্যন্ত যে আলোচনা হয়েছে তাতে সব পণ্যে শুল্ক ছাড় দিতে রাজি হয়নি বাংলাদেশ। এদিকে এলডিসি থেকে উত্তরণের পর জাপানের বাজারে শুল্ক সুবিধা অব্যাহত না থাকলে বাংলাদেশি পণ্য স্বাভাবিক শুল্কের মুখে পড়বে। এতে রপ্তানি ২৫ থেকে ৩০ কোটি ডলার পর্যন্ত কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ইপিএ কার্যকর হলে প্রথম থেকেই তৈরি পোশাকসহ বাংলাদেশের সাত হাজার ৩৭৯টি পণ্য জাপানের বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাবে। বিপরীতে শুরুতে জাপানের এক হাজার ৩৯টি পণ্য বাংলাদেশে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে। এরপর ছয় থেকে আট বছরে ধাপে ধাপে আরও দুই হাজার ৭০২টি জাপানি পণ্য শুল্ক ছাড় পাবে। এক পর্যায়ে উভয় দেশে মোট ৯ হাজার ৩৫৪টি জাপানি পণ্যে কোনো শুল্ক থাকবে না। এর মধ্যে বাংলাদেশি পণ্য সাত হাজার ৪৩৬টি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, রাজস্ব ঝুঁকি থাকলেও শুল্ক ছাড় ধাপে ধাপে কার্যকর হওয়ায় তাৎক্ষণিক চাপ সীমিত থাকবে। একই সঙ্গে এই সময়ের মধ্যে দেশীয় শিল্পকে প্রতিযোগিতামূলক করে তোলার সুযোগও পাওয়া যাবে।
বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান বলেন, সব জাপানি পণ্য একসঙ্গে শুল্কমুক্ত হবে না। ফলে রাজস্ব ক্ষতি বা জাপানি পণ্যের অতিরিক্ত আমদানির ঝুঁকি খুব বেশি নয়। উন্নত দেশগুলো ক্রমান্বয়ে শুল্ক কমাচ্ছে। বাংলাদেশকেও ধীরে ধীরে কম শুল্ক কাঠামোর দিকে যেতে হবে।
উল্লেখ্য, আগামী ৬ ফেব্রুয়ারি জাপানের রাজধানী টোকিওতে বাংলাদেশ-জাপান ইপিএ সই হওয়ার কথা রয়েছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইপিএ কার্যকর হলে বাংলাদেশের জন্য তৈরি পোশাক খাতে বড় সুযোগ সৃষ্টি হবে। বর্তমানে জাপানে পোশাক রপ্তানিতে দুই ধাপের উৎপাদন শর্ত মানতে হয়। কিন্তু ইপিএ কার্যকর হলে এক ধাপের উৎপাদন সম্পন্ন করলেই পোশাক রপ্তানি করা যাবে। এতে উৎপাদন ব্যয় কমবে এবং রপ্তানিতে প্রতিযোগিতা বাড়বে।
চামড়া ও চামড়াজাত খাতের ২০৬টি পণ্য ভবিষ্যতে আলোচনার মাধ্যমে জাপানে শুল্কমুক্ত সুবিধা পেতে পারে। তবে জাপান এই খাতকে স্পর্শকাতর হিসেবে বিবেচনা করে এবং এখন পর্যন্ত তাদের কোনো ইপিএ বা মুক্তবাণিজ্য চুক্তিতে এই খাত অন্তর্ভুক্ত হয়নি। এ ছাড়া বাংলাদেশের এক হাজার ২৫৯টি কৃষিপণ্যের বেশির ভাগই চুক্তির শুরুতে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে না। ইপিএ কার্যকর হলে বাংলাদেশের ১২০টি সেবা খাত জাপানে এবং জাপানের ৯৭টি সেবা খাত বাংলাদেশে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাপানের যাত্রীবাহী গাড়ির ক্ষেত্রে ১২ বছরে ধাপে ধাপে শুল্ক কমিয়ে শূন্যে নামানো হবে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, রাজস্ব ক্ষতি বিবেচনায় বাংলাদেশ শুরুতেই জাপানি গাড়িকে শুল্কমুক্ত করার প্রস্তাবে সম্মতি দেয়নি। তবে ভবিষ্যতে অন্য কোনো দেশকে গাড়িতে শুল্কমুক্ত সুবিধা দিলে জাপান স্বয়ংক্রিয়ভাবে একই সুবিধা পাবে– এমন প্রস্তাব দিয়েছে
















Leave a Reply